বিশ্বে জ্বালানি উদ্বেগ বাড়লেও তেলের মজুতে স্বস্তিতে চীন

ছবি সংগৃহীত

 

অনলাইন ডেস্ক : হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীন তাৎক্ষণিকভাবে ওই অঞ্চল থেকে জ্বালানি ক্রয় বাড়াবে— এমন সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুরোপুরি শুরু হলে যুদ্ধকালীন সময়ে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা চীনগামী বিপুলসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ আবারও গন্তব্যের পথে যাত্রা করবে। এসব জাহাজ চীনা বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করলে দেশটিতে তেল সরবরাহে সাময়িকভাবে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে চীন। ইরান যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে যখন বিভিন্ন দেশ জ্বালানি সংকটে ভুগছে, তখন চীনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় পূর্ণ রয়েছে। একই সঙ্গে বেইজিং তাদের বিশাল কৌশলগত মজুত থেকে কোনো তেল উত্তোলন করেনি। অন্যদিকে শোধনাগারগুলোর সংরক্ষণাগার পেট্রল, ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যে প্রায় পূর্ণ হয়ে আছে।

যুদ্ধ চলাকালে চীন দৈনিক তেল আমদানি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উচ্চমূল্যের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। হরমুজ প্রণালী প্রায় অচল হয়ে পড়ার সময় বৈশ্বিক বাজারে যে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছিল, আমদানি কমে যাওয়ায় তা কিছুটা প্রশমিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আগে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি তেল কিনে রাখার কারণেই চীন এমন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছিল। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং জাতীয় আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকতেই বিগত বছরগুলোতে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করেছে দেশটি।

এ ছাড়া বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমানোর লক্ষ্যেও অতিরিক্ত তেল আমদানি করেছিল বেইজিং। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বৈদেশিক সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করার পদক্ষেপ নেওয়ার পর থেকে চীন বিদেশি ব্যাংক আমানত বা মার্কিন সরকারি ঋণপত্রে অর্থ রাখার পরিবর্তে তেলের মতো পণ্যভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখনও ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থানে ফিরে আসেনি, তবু জ্বালানি বাজারের বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, চীন দ্রুত আগের আমদানি পর্যায়ে ফিরে যাবে না।

অক্সফোর্ড জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের চীনবিষয়ক তেল বিশেষজ্ঞ ফিলিপ অ্যান্ড্রুজ-স্পিড বলেন, চীনের তেল কোম্পানিগুলো মূল্য বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকবে এবং তারা ধীরে ধীরে বাজারে কেনাকাটা বাড়াবে।

যুদ্ধের সময় চীনা কোম্পানিগুলো নিজেদের করপোরেট মজুত থেকে অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে শোধনাগার সচল রাখে। তবে মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সতর্ক অবস্থানের কারণে পেট্রল, ডিজেল, বিমান জ্বালানি ও অন্যান্য পরিশোধিত পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাবে গত এপ্রিল ও মে মাসে জ্বালানিচালিত গাড়ির বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

একই সময়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে চলতি বসন্তে চীন অধিকাংশ পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি বন্ধ রাখে। এর ফলে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে সীমিত শোধন সক্ষমতাসম্পন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনকারী দেশে পরিণত হয় চীন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য পরিশোধিত জ্বালানির অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়া এবং রপ্তানি স্থগিত থাকার কারণে দেশটির সংরক্ষণাগারগুলো পেট্রল, ডিজেল ও বিমান জ্বালানিতে প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে অপরিশোধিত তেল কেনা কিংবা তা শোধনের তেমন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না তেল কোম্পানিগুলো।

উল্লেখ্য, জ্বালানি নীতিতে বরাবরই সতর্ক অবস্থান নিয়ে থাকে বেইজিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের কাছে তেল বিক্রি ইরান ও রাশিয়ার অর্থনীতিতে ৬ শতাংশ বা তারও বেশি অবদান রেখেছে। সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» ৩০ জুলাই সারাদেশে সিএনজি স্টেশন বন্ধের ঘোষণা

» এদেশে শেখ পরিবার আর নেতৃত্ব দিতে পারবে না : হাসনাত আব্দুল্লাহ

» জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রধান কারিগর যাদু মিয়া : তথ্যমন্ত্রী

» ছাগলকাণ্ডে আলোচিত মতিউরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন বিষয়ে আদেশ ৩ আগস্ট

» স্কুলমুখী করতে সাড়ে তিন লাখ শিশুকে স্কুল ড্রেস দেবে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী

» মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এই প্রজন্ম হারিয়ে ফেললে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

» মাঠ পর্যায়েই হবে জন্মতারিখ সংশোধন, সহজ হচ্ছে প্রবাসী নিবন্ধন

» রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিদায়ী নৌপ্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ

» সদ্য লঞ্চ হওয়া গ্যালাক্সি এ৩৭ ৫জি’র দাম কমালো স্যামসাং

» ‘ইকোফিল’ উদ্যোগ চালু করল এনার্জিপ্যাক

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

বিশ্বে জ্বালানি উদ্বেগ বাড়লেও তেলের মজুতে স্বস্তিতে চীন

ছবি সংগৃহীত

 

অনলাইন ডেস্ক : হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীন তাৎক্ষণিকভাবে ওই অঞ্চল থেকে জ্বালানি ক্রয় বাড়াবে— এমন সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুরোপুরি শুরু হলে যুদ্ধকালীন সময়ে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা চীনগামী বিপুলসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ আবারও গন্তব্যের পথে যাত্রা করবে। এসব জাহাজ চীনা বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করলে দেশটিতে তেল সরবরাহে সাময়িকভাবে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে চীন। ইরান যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে যখন বিভিন্ন দেশ জ্বালানি সংকটে ভুগছে, তখন চীনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় পূর্ণ রয়েছে। একই সঙ্গে বেইজিং তাদের বিশাল কৌশলগত মজুত থেকে কোনো তেল উত্তোলন করেনি। অন্যদিকে শোধনাগারগুলোর সংরক্ষণাগার পেট্রল, ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যে প্রায় পূর্ণ হয়ে আছে।

যুদ্ধ চলাকালে চীন দৈনিক তেল আমদানি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উচ্চমূল্যের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। হরমুজ প্রণালী প্রায় অচল হয়ে পড়ার সময় বৈশ্বিক বাজারে যে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছিল, আমদানি কমে যাওয়ায় তা কিছুটা প্রশমিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আগে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি তেল কিনে রাখার কারণেই চীন এমন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছিল। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং জাতীয় আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকতেই বিগত বছরগুলোতে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করেছে দেশটি।

এ ছাড়া বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমানোর লক্ষ্যেও অতিরিক্ত তেল আমদানি করেছিল বেইজিং। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বৈদেশিক সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করার পদক্ষেপ নেওয়ার পর থেকে চীন বিদেশি ব্যাংক আমানত বা মার্কিন সরকারি ঋণপত্রে অর্থ রাখার পরিবর্তে তেলের মতো পণ্যভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখনও ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থানে ফিরে আসেনি, তবু জ্বালানি বাজারের বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, চীন দ্রুত আগের আমদানি পর্যায়ে ফিরে যাবে না।

অক্সফোর্ড জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের চীনবিষয়ক তেল বিশেষজ্ঞ ফিলিপ অ্যান্ড্রুজ-স্পিড বলেন, চীনের তেল কোম্পানিগুলো মূল্য বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকবে এবং তারা ধীরে ধীরে বাজারে কেনাকাটা বাড়াবে।

যুদ্ধের সময় চীনা কোম্পানিগুলো নিজেদের করপোরেট মজুত থেকে অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে শোধনাগার সচল রাখে। তবে মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সতর্ক অবস্থানের কারণে পেট্রল, ডিজেল, বিমান জ্বালানি ও অন্যান্য পরিশোধিত পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাবে গত এপ্রিল ও মে মাসে জ্বালানিচালিত গাড়ির বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

একই সময়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে চলতি বসন্তে চীন অধিকাংশ পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি বন্ধ রাখে। এর ফলে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে সীমিত শোধন সক্ষমতাসম্পন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনকারী দেশে পরিণত হয় চীন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য পরিশোধিত জ্বালানির অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়া এবং রপ্তানি স্থগিত থাকার কারণে দেশটির সংরক্ষণাগারগুলো পেট্রল, ডিজেল ও বিমান জ্বালানিতে প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে অপরিশোধিত তেল কেনা কিংবা তা শোধনের তেমন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না তেল কোম্পানিগুলো।

উল্লেখ্য, জ্বালানি নীতিতে বরাবরই সতর্ক অবস্থান নিয়ে থাকে বেইজিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের কাছে তেল বিক্রি ইরান ও রাশিয়ার অর্থনীতিতে ৬ শতাংশ বা তারও বেশি অবদান রেখেছে। সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com